চম্পুর ভূমিকা, সংজ্ঞা, শ্রেণীবিভাগ

চম্পুর ভূমিকা, সংজ্ঞা, শ্রেণীবিভাগ


আর্যাবর্তবর্ণনম

(নলচম্পুঃ — প্রথমোচ্ছাসঃ)


সংস্কৃত কাব্য দু-প্রকার দৃশ্য ও শ্রব্য। শ্রব্যকাব্য আবার তিনপ্রকার — গদ্য, পদ্য এবং চম্পু। চম্পুকাব্য গুরুত্বের বিচারে মহাকাব্যাদির সমকক্ষ না হলেও সংস্কৃত সাহিত্যের কলেবর বৃদ্ধিতে এর অবদানও কম নয়।



চম্পুর সংজ্ঞা : ‘চম্পু’শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ সাহিত্যদর্পণের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে ‘কুসুমপ্রতিমা’ টীকায় বলেছেন – “চমৎকৃত্য পুণাতি সহৃদয়ান্ বিস্মতীকৃত্য প্রসাদয়তীতি চম্পুরিতি" (৬/৩১২)। অর্থাৎ সহৃদয় ব্যক্তিকে যা চমৎকৃত বা প্রসন্ন করে তারই নাম চম্পু। আলংকারিক দণ্ডী সর্বপ্রথম সপ্তম শতাব্দীতে কাব্যের প্রকারভেদ নির্ণয়কালে তাঁর কাব্যাদর্শ গ্রন্থে চম্পুকাব্যের লক্ষণ দিতে গিয়ে বলেছেন – “গদ্যপদ্যময়ী ভাষা চম্পুরিত্যভিধীয়তে” (১/৩১)। আলংকারিকদের মতে গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণে রচিত কাব্যই চম্পুপদবাচ্য।


চম্পূর লক্ষণ : চম্পূর লক্ষণগুলি হল – (১) চম্পুতে গদ্য ও পদ্য উভয়ই প্রায় সমানভাবে থাকে। (২) বিষয়বস্তু পুরাকাহিনি বা বিবিধ বিষয়। (৩) গদ্যের ওজঃ গুণ এবং পদ্যে গীতিধর্মিতা এবং ছন্দবৈচিত্র্য লক্ষণীয়। (৪) শব্দালংকার, অর্থালংকারের নিপুণ প্রয়োগ দেখা যায়। (৫) দীর্ঘ সমাসবদ্ধ পদের ব্যবহার দেখা যায়।


প্রাচীনত্ব : বৈদিক সাহিত্য বিশেষত ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, মহাভারত, পুরাণ এবং আখ্যানভাগ, পালিভাষায় বৌদ্ধজাতক প্রভৃতিতে গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণ উল্লেখের দাবি রাখে।


উদ্দেশ্য : বৈষ্ণব এবং জৈন ধর্মাবলম্বীগণ ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে কয়েকটি চম্পুকাব্য রচনা করেন। গদ্যকাব্যের গতানুগতিক একঘেয়েমি থেকে পাঠক মনে বৈচিত্র্যের আস্বাদ দিতেই চম্পুকাব্যের সৃষ্টি হয়েছে।


গুরুত্ব : রচনায় সমাসবাহুল্য, নানাশাস্ত্রে কবিদের পান্ডিত্য প্রদর্শনের চেষ্টা, অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার, পদ্যকাব্যের কমনীয়তা ও মাধুর্য এবং গদ্যকাব্যের বলিষ্ঠ গাম্ভীর্যের অভাবে চম্পুকাব্য শুধু সংস্কৃত সাহিত্যের কলেবর বৃদ্ধি ছাড়া কোনো অভিনবত্ব দিতে পারেনি।


রচনাকাল : খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর পূর্বে রচিত কোনো চম্পুকাব্যের নিদর্শন পাওয়া যায়নি।


কাব্যের শ্রেণিবিভাগ : কাহিনি অনুসারে চম্পূকাব্যগুলিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় – (১) রামায়ণ আশ্রিত ভোজের রামায়ণচম্পু, পতগুলির সীতাবিজয়, রামচন্দ্রের রামচন্দ্রচ প্রভৃতি। (২) মহাভারত আশ্রিত – ত্রিবিক্রমভট্টের নলচম্পু, অনন্তভট্টের ভারতচম্পু, চক্রকবির দ্রৌপদী পরিণয় প্রভৃতি। (৩) কৃষ্ণলীলা আশ্রিত (প্রধানত ভাগবতের দশম স্কন্দ অবলম্বনে) কালিদাসের ভাগবতচম্পু, জীব গোস্বামীর গোপালচম্পু, কবিকর্ণপুরের আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ প্রভৃতি। (৪) জীবনচরিত আশ্রিত (বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের আচার্য পুরুষদের জীবনাবলম্বনে) সোমদেবের যশস্তিলকচম্পু, হরিচন্দ্রের জীবধরচম্পূপ্রভৃতি। (৫) পুরাণ আশ্রিত (কৃষ্ণলীলা ছাড়া অন্য - কেশবভট্টের নৃসিংহচম্পু, শেষশ্রীকৃষ্ণের পারিজাতহরণ চম্পু নারায়ণভট্টের রাজসূয় প্রবন্ধ স্বাহাসুধাকর চম্প প্রভৃতি। (৬) ইতিহাস আশ্রিত – শ্রীনিবাসকবির আনন্দরঙ্গ বিজয়চম্প তিরুমলাম্বার বরদাম্বিকা পরিণয় প্রভৃতি।


কাব্যের ক্রমবিকাশ : দণ্ডীর পূর্ববর্তী খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত এলাহাবাদ স্তম্ভলেখ নামে পরিচিত হরিষেণের সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যবিজয় প্রশস্তি চম্পুকাব্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।


(Part  — 1)