নলচম্পুঃ রচনা বৈশিষ্ট্য
![]() |
| নলচম্পুঃ রচনা বৈশিষ্ট্য |
আর্যাবর্তবর্ণনম
(নলচম্পুঃ — প্রথমোচ্ছাসঃ)
রচনা বৈশিষ্ট্য
ত্রিবিক্রমভট্ট তাঁর পূর্ববর্তী সকল পণ্ডিতদের উৎকৃষ্ট গুণগুলি একত্রিত করে ‘নলচম্পু’ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ (প্রবন্ধ) কাব্য রচনা করেছেন। এই কাব্যরসের শাশ্বতপ্রবাহ মহান বিদ্বানগণ লাভ করতে পারেন, সাধারণ ব্যক্তি নয়। ‘নলচম্পূ’ কাব্যের বৈশিষ্ট্যগুলি হল :
সুখাত্মক কাব্য : ‘নলচম্পু' কাব্য সপ্তম উচ্ছ্বাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে রাজা নলের দময়ন্তীর সঙ্গে দেখা করার বৃত্তান্ত আছে। ‘নলচম্পু’-র কথাভাগ দুঃখান্তক, কিন্তু ত্রিবিক্রম নিজের রচনাশৈলীর দ্বারা কাব্যের দুঃখের ঘটনাকে সুখের বাতাবরণে পরিণত করেছেন। নলোপাখ্যানের ‘দময়ন্তী' পরিত্যাগ, আদি মর্মান্তিক কথাভাগ এই কাব্যে অনুপস্থিত থাকায় কাব্যটি অসম্পূর্ণ। তথাপি কাব্যে সরস রমণীয় প্রসাদগুণযুক্ত শ্লেষ অলংকারের বহুল প্রয়োগ দেখা যায়।
গুণ ও অলংকারের সমন্বয় : প্রসাদকান্তি শ্লেষগুণযুক্ত, শব্দশ্লেষ, অর্থশ্লেষ-অলংকার মণ্ডিত পদগুলির যথার্থ প্রয়োগ দেখা যায়।
“প্রসন্নাঃ কান্তিহারিণ্যো নানাশ্লেষবিচক্ষণাঃ।
ভবন্তি কস্যচিৎ-পুণ্যৈমুখে বাচো গৃহে স্ত্রিয়ঃ।।” (১/৪)
এই গুণ ও অলংকারে মণ্ডিত বাণী নিত্যপ্রসন্ন, কান্তিযুক্ত নানাগুণযুক্ত গৃহের রমণীর মতো সুখ দান করে।
ধনুর্ধারী বাণের সাদৃশ্য : ত্রিবিক্রমভট্ট নিজেই কাব্যকে ধনুর্ধারী বাণের সঙ্গে তুলনা করেছেন -
“কিং করেস্তেন কাব্যেন কিং কাণ্ডেন ধনুাতঃ।
পরস্য হৃদয়ে লগ্নং ন ঘূর্ণয়তি যচ্ছিবঃ।।” (১/৫)
অর্থাৎ, কবির এমন কাব্যের কী লাভ, যে কাব্য শ্রোতার হৃদয়কে প্রভাবিত করতে পারে না অথবা ধনুর্ধারী বাণ শত্রুর বক্ষকে না-হেলিয়ে দেয়? শ্লেষযুক্ত অনুপ্রাস তথা যমক অলংকারের ছটা ‘নলচম্পূ’-র সর্বত্র দেখা যায়।
চরিত্র : এই কাব্যে ৩৩টি পুরুষ, ২৯টি স্ত্রী, ১টি কিন্নর-মিথুনকুল সহ মোট ৬৩টি চরিত্র আছে। এখানে নায়ক নিষধাপতি নল, কুণ্ডিনপুরের রাজা ভীমের কন্যা দময়ন্তী হলেন নায়িকা। প্রবন্ধপটুতা, কাব্যসৌষ্ঠব, প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য প্রভৃতি কারণে এটি সর্বোৎকৃষ্ট চম্পুকাব্য।
পদবিন্যাস : এই কাব্যটি রচনাকালে লেখকের খুব দৃষ্টি ছিল কাব্যের পদবিন্যাসের দিকে। ফলে কাব্যের কোথাও নীরসতা দেখা যায়নি।
সহজ-সরল ভগ্নশ্লেষ : সংস্কৃত সাহিত্যে সহজ-সরল ভগ্নশ্লেষের প্রয়োগ ‘নলচম্পূ’ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায়নি।
অর্থগৌরব : চম্পুকাব্যের প্রতি শ্লোকে অর্থগৌরব এবং মৃদুতা লক্ষ করা যায়।
“বাচঃ কাঠিন্যমায়ান্তি ভঙ্গশ্লেষ বিশেষতঃ। নোদ্বেগস্তত্র কর্তব্যো যস্মান্নৈকো রসঃ কবেঃ।।” (১/১৬)
কবি শ্লোকের ভগ্নশ্লেষের কাঠিন্য স্বীকার করেছেন।
পদপ্রয়োগে দ্রুত পরিবর্তন : ২/৩ চরণে পদপ্রয়োগে খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তন – এই গ্রন্থের অপর একটি বৈশিষ্ট্য।
বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার : ত্রিবিক্রমভট্ট এই গ্রন্থের সর্বত্র বিপ্রলম্ভ- শৃঙ্গার রসের নিমিত্ত সেই উদ্দীপন সামগ্রীর যথাস্থানে প্রয়োগ করেছেন। এ ছাড়া তিনি বীর, রৌদ্র, করুণ, ভয়ানক প্রভৃতি রসের প্রয়োগ করেন । অঞ্জন পর্বতের সমান দুর্দান্ত শূকরের শরীর বর্ণনায় ভয়ানক রসের প্রয়োগ করেছেন। আর শূকরের ক্রোধজনিত আচরণে রুদ্র রসের আস্বাদ পাওয়া যায়। চতুর্থ উচ্ছ্বাসের শেষের দিকে সপত্নীক বীরসেনের প্রস্থান দৃশ্যে করুণরসের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
বস্তুচরিত্র : ত্রিবিক্রম বস্তুচরিত্র নির্মাণে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। সামান্য বস্তুকে তিনি এমনভাবে চিত্রিত করতেন যে পাঠককুলের কাছে তা ছবির মতো প্রকাশ পেত।
“বল্লীবল্কপিনদ্ধধূসরশিরাঃ স্কন্ধে দধদণ্ডকং....
আয়াতঃ ক্রমুকত্বচা বিরচিতাং ভিক্ষাপুটীমুদ্বহন্।।” (১/৫২)
শূকরকে হত্যা করে রাজা নল ক্লান্ত হয়ে একটি গাছে উঠে দময়ন্তীর চিন্তা করছেন। সেই সময় এক পথিক সেই গাছের তলায় এল। তার বর্ণনায় কবির সামান্য বস্তুর বর্ণনানৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায় উপরোক্ত শ্লোকে।
যামুন ত্রিবিক্রম : ত্রিবিক্রমের অদ্ভুত কল্পনাপ্রবণ রচনার জন্য তাঁর নাম যামুন-ত্রিবিক্রম দেওয়া হয়েছে। ‘নলচম্পূ’-র প্রথম উচ্ছ্বাসের প্রথম দিকে লেখক বলেছেন “যত্র গৃহে গৌৰ্যঃ স্ক্রিয়, মহশ্বেরো লোকঃ সশ্রীকা হরয়ঃ পদে পদে ধনদা সন্তি লোকপালাঃ। কেবলং ন সুরাধিপো রাজা। ন চ বিনায়কঃ কশ্চিৎ।” অর্থাৎ স্বর্গে গৌরী (গৌরবর্ণ যুক্তা অথবা শুদ্ধ ভাবযুক্তা নারী), মহেশ্বর (শিব), হরি (বিষ্ণু), ধনদ (কুবের) কেবল একজন আছেন কিন্তু আর্যাবর্তের ঘরে ঘরে গৌরবর্ণ বা শুদ্ধ ভাবযুক্তা স্ত্রীরা, মহান সমৃদ্ধ, শোভাযুক্ত ঘোড়া, ধন দানকারী তথা লোকপালগণ আছেন। স্বর্গে দেবতাদের রাজা সুরাধিপতি ইন্দ্র কিন্তু আর্যাবর্তে সুরাধিপ অর্থাৎ মদ্যপানকারী রাজা নেই। স্বর্গে আছেন বিনায়ক বা গণেশ কিন্তু আর্যাবর্তে বি-নায়ক অর্থাৎ বিরুদ্ধ নায়ক বা রাজার বিরুদ্ধাচারী কেউ নেই।
ভৌগোলিক তথ্য : ‘নলচম্পু' কাব্যের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ভারতের ভৌগোলিক অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এ থেকে লেখকের ভূগোল ও ইতিহাস জ্ঞানের পরিচয় পাই। প্রাচীন ভারতের প্রসিদ্ধ জনপদ, নগর, পর্বত এবং নদীর (বরদা, সরস্বতী, পয়োয়ী) পরিচয় পাই। এই কাব্যে আর্যাবর্ত, মহারাষ্ট্র জনপদ, কুণ্ডিনপুর (বিদর্ভ), নিষধা নগরী, শ্রীশৈল বিন্ধ্যাচল পর্বত প্রভৃতির উল্লেখ আছে। যেমন —
(১) আর্যাবর্ত : গুপ্তযুগে ‘আর্যাবর্ত’ কুমারী দ্বীপ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। পুরাণগুলিতে আর্যাবর্তের পর্যায় শব্দ ‘ভারতবর্ষ” নামে অভিহিত। যাই হোক, আর্যাবর্ত সবসময় আর্যদের সংস্কৃতি তথা সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল।
(২) মহারাষ্ট্র : বরদা নদীর তটের কাছে মহারাষ্ট্র অবস্থিত। এর কাছে বিদর্ভা নদী প্রবাহিত।
(৩) কুণ্ডিন নগর : বিদর্ভের রাজধানী হল কুণ্ডিন নগর।
(৪) নিষধা নগরী : পুরুষোত্তমের নিবাস নিষধা জনপদ।
(৫) বরদা : এই নদীটি বর্তমানে বর্ধা নদী নামে পরিচিত।
(৬) পয়োরী : এর বর্তমান নাম পূর্ণা। কুণ্ডিনপুরের পাশে প্রবাহিত নদী।
(৭) শ্রীশৈল : বিন্ধ্যাচল পর্বতের (দক্ষিণ ভারত) দক্ষিণ দিকে এক পর্বত হল শ্রীশৈল।
অন্যান্য চরিত্র : আলোচ্য গ্রন্থের নায়ক-নায়িকা অর্থাৎ নলরাজ ও দময়ন্তী ছাড়া আরও অনেক চরিত্র এখানে রয়েছে। যেমন –
(১) বীরসেন : আর্যাবর্তের রাজা নলের পিতা হলেন বীরসেন।
(২) শ্রুতিশীল : রাজা নলের বিদ্বান অমাত্য হলেন শ্রুতিশীল।
(৩) দমনকমুনি : সম্ভানলাভের জন্য এই মুনি আশীর্বাদ করেন রাজা ভীম ও রানি প্রিয়ঙ্গমঞ্জরীকে।
(৪) প্রিয়ম্বদিকা : দময়ন্তীর এক সখী হলেন প্রিয়ম্বদিকা।
(৫) হংস : হংস হল দূত, দময়ন্তীর সংবাদবাহক। গলার হার (মুক্তাবলী) এর দ্বারা নলরাজকে দময়ন্তী প্রেরণ করেন।
(৬) রাজা : বীরসেন (নলের পিতা), ভীম-বিদর্ভের রাজা দময়ন্তীর পিতা।
(৭) প্রিয়ঙ্গুমঞ্জরী : ইনি হলেন বিদর্ভের রানি এবং দময়ন্তীর মাতা।
সমাজচিত্র : ত্রিবিক্রমভট্টের ‘নলচম্পু' একটি সামাজিক দর্পণ। তাই এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজের (দশম শতাব্দী) নানা চিত্র পাওয়া যায়। যেমন –
(১) রাষ্ট্রকূট হিন্দু সংস্কৃতি : এই গ্রন্থের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের অন্তর্গত রাষ্ট্রকূট হিন্দু সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখতে পাই। তখন দেশ রাজতন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত হত। রাজপুত্র উচ্চশিক্ষিত হলে পিতা পুত্রকে গঙ্গা, গোদাবরী, নর্মদা প্রভৃতি পবিত্র নদীর জলে অভিষিক্ত করে বৃদ্ধাবস্থায় অস্তিমজীবন বনে কাটিয়ে দিতেন। বীরসেন তেমনই পুত্র নলকে রাজ্যপাটের দায়িত্ব দিয়ে বনে গমন করেন।
(২) মন্ত্রী : রাজার মন্ত্রী হতেন নানা শাস্ত্রে পণ্ডিত (ব্রাহ্মণ)। প্রয়োজনে মন্ত্রী ক্রুদ্ধ হয়ে রাজাকে সৎকর্ম করতে বাধ্য করতেন, যেমন নলরাজের মন্ত্রী শ্রুতিশীল।
(৩) ব্রাক্ষ্মণ : সমাজে বেদজ্ঞ বিদ্বান ব্রাহ্মণ পূজার্চনা করতেন। ব্রাহ্মণ হতেন সত্যবাদী, সহজ, সরল, ত্যাগী এবং তেজস্বী।
(৪) সেনা : রাজ্য রক্ষার্থে চতুরঙ্গ সেনা (হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক বাহিনী) থাকত। তাদের অস্ত্র ছিল ধনুর্বাণ ও খঙ্গ। যুদ্ধ জয় করে ফেরার পথে উন্মত্ত হয়ে তারা তীর্থস্থান, যজ্ঞস্থল, যজ্ঞস্তম্ভ, উদ্যান প্রভৃতি ধ্বংস করতে পারত না। গৈরিক, রক্ত, সাদা বর্ণের পট-মণ্ডপে সৈন্যশিবির হত, সৈন্যদলে কুকুর রাখা হত।
(৫) স্বয়ংবর সভা : তখনকার দিনে রাজকন্যাদের স্বয়ংবর সভার প্রচলন ছিল। দময়ন্তীর স্বয়ংবরে দেবতা, বিশিষ্ট রাজা এবং নল প্রমুখ আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। বিশিষ্ট অতিথিদের নানা অলংকারে, বস্ত্রে সজ্জিত নগরের বধূগণ স্বাগত জানাত সুগন্ধযুক্ত জল সিঞ্চনে। তোরণ, গেট প্রভৃতি পতাকা দিয়ে সাজানো হত। দ্বারে মঙ্গলঘট থাকত, রমণীগণ দই, দূর্বা, চাল, পুষ্প, ফল সহ মঙ্গল দ্রব্যে থালা সাজিয়ে মঙ্গলগীত গাইত। ছেলেরা কুণ্ডলহার, কঙ্কণ, অঙ্গুরীয় প্রভৃতি পরিধান করত। অশ্বারোহীরা চুস্ত বস্ত্র, মাথায় পাগড়ি পরত। উত্তরীয় বস্ত্রও ব্যবহার করত। কাজল, বড়ো বড়ো মতির হারের ব্যবহার ছিল।
(৬) সংগীত ও চিত্রকলা : সে যুগে সংগীত ও চিত্রকলার অসাধারণ জ্ঞান ছিল। ষড়জ, মধ্যম, গান্ধার, তথা পঞ্চস্বরের জ্ঞান ছিল। মাটি, কাঠের উপরে ছবি আঁকা হত। বীণা, মৃদঙ্গ, বাঁশি প্রভৃতি বাদ্য ব্যবহার হত।
(৭) অন্যান্য : ত্রিকাল সন্ধ্যার প্রচলন ছিল। নলরাজের যতই কাজ থাক না কেন তিনি তা মেনে চলতেন। সূর্য, শংকর, নারায়ণ, কুমারীর গৌরী পূজা, দানকার্য, গো-দান, ব্রাহ্মণ ভোজনের প্রচলন ছিল। ডাল, মধু, দুগ্ধ, দধি, ফল, শাক, মাংস প্রভৃতি খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করত। সে যুগে রন্ধন প্রণালীর অতি উন্নতি হয়েছিল।
(Part — 3)
