নলচম্পুর উৎস, নামকরণ, বিষয়বস্তু | আর্যাবর্তবর্ণনম্ | Class 12



নলচম্পুর উৎস, নামকরণ, বিষয়বস্তু




উৎস :

"আর্যাবর্তবর্ণনম্” পাঠ্যাংশটি দশম শতাব্দীর লেখক ত্রিবিক্রমভট্ট রচিত বিখ্যাত চম্পুকাব্য 'নলচম্পূঃ'-র প্রথম উচ্ছ্বাস থেকে নেওয়া | হয়েছে।

নামকরণ :

যে-কোনো সাহিত্যে নামকরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাই লেখক গল্প, উপন্যাস, কাব্যের নামকরণের ব্যাপারে খুব যত্নশীল হন। সাহিত্যে নামকরণ – নায়কের নাম অনুসারে, গ্রন্থের বিষয়বস্তু অনুসারে অথবা গল্পের ভাবার্থ বা ব্যঞ্জনানুসারে লেখক দিয়ে থাকেন। ত্রিবিক্রমভট্ট তাঁর চম্পুকাব্যের নামকরণ নায়ক রাজা নলের নামানুসারে করেছেন। সপ্তম উচ্ছ্বাস বিশিষ্ট চম্পুকাব্যের নাম রাখা হয়েছে 'নলচম্পু'। কিন্তু পাঠ্যাংশের নামকরণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সদস্যবৃন্দ। 'নলচম্পু'-র প্রথম উচ্ছ্বাসের কিছু অংশ এখানে পাঠ্যরূপে বিবেচিত হয়েছে, যার নামকরণ করা হয়েছে "আর্যাবর্তবর্ণনম্”।

'আর্যাবর্ত' শব্দটির ব্যুৎপত্তি করলে দাঁড়ায় —  আর্য-আ-বৃৎ + ঘঞ (অধিকরণ বাচ্যে)। অর্থ হল — যেখানে আর্যগণ আবর্তিত অর্থাৎ বারবার জন্মগ্রহণ করেছেন বা ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেই স্থানের নাম আর্যাবর্ত।

'আর্যাবর্তবর্ণনম্' শব্দটির অর্থ হল —  আর্যাবর্তের বর্ণনা আছে যেখানে। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে আর্যাবর্ত বলতে ভারতবর্ষকে বোঝানো হয়েছে। আর্যাবর্তের নানা বৈশিষ্ট্য, যেমন — তার স্থানমাহাত্ম্য, মানুষের আচার-ব্যবহার, জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ প্রভৃতির বর্ণনা আলোচ্য পাঠ্যাংশে থাকায় সংসদের সদস্যবৃন্দ এর নামকরণ করেছেন “আর্যাবর্তবর্ণনম্”। পাঠ্যাংশের প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ চরণে লেখক 'আর্যাবর্ত' নাম ব্যবহার করে বলেছেন —  "আচার্যভবনমাৰ্যমর্যাদোপদেশানামার্যাবর্তো নাম দেশঃ।” সমস্ত অনুচ্ছেদ জুড়ে রয়েছে 'আর্যাবর্ত' নামক মহান দেশের বিস্তৃত পরিচয়। এই আর্যাবর্ত যে ভারতবর্ষ তার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক বলেছেন- "দেশঃ পুণ্যতমোদেশঃ কস্যাসৌ ন প্রিয়ো ভবেৎ।" অতএব বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পাঠ্যাংশের নামকরণ "আর্যাবর্তবর্ণনম্” যথাযথ হয়েছে।

বিষয়বস্তু :

লেখক ত্রিবিক্রমভট্ট প্রাচীন ভারতের তথা আর্যাবর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন —  আর্যাবর্ত নামের দেশ সকল দেশের সেরা। এখানে সমস্ত পৃথিবীমণ্ডলের সৌন্দর্য একত্রিত হয়েছে। স্বর্গলোকের মতো সেবা বা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এখানে পাওয়া যায়। গ্রাম্য-কবিদের কথা কাব্যের সমান, নীরস লোকেরাও মনোহর, অথবা জল ও শস্যের দ্বারা দেশ শোভাযুক্ত। মহাভারত নামক কাব্য অথবা ভারতবর্ষের অলংকার স্বরূপ এই দেশ সকল দেশের অগ্রগণ্য - "অগ্রণীঃ সর্ববিষয়াণাম্।" ব্যাকরণ না-পড়েও প্রকৃতি, প্রত্যয়, নিপাত, উপসর্গ, লোপ তথা বর্ণবিকারের দোষ দেখা যায় না। পক্ষান্তরে প্রজাদের মধ্যে পতন, উপদ্রব, লোপ তথা বর্ণ-ব্যবস্থার কোনো প্রকার বিকার দেখা যায় না এই দেশে। ভগবান শিবের জটাজুটের সমান বিকশিত পীত তথা নীলপদ্মের পরাগরেণু দ্বারা হলুদবর্ণে শোভিত হংসের মতো শোভাযুক্ত অত্যন্ত চঞ্চলতাযুক্ত চকোর, চক্রবাক, সারস (হংস)-দের দ্বারা শোভা পাচ্ছে নদীর তীরসমূহ। রাজা ভগীরথের কীর্তি-পতাকার দ্বারা তৈরি, স্বর্গে পৌঁছোনোর সিঁড়ির মতো গলির মধ্যে প্রবাহিত এমন স্রোতস্বিনী গঙ্গার জলের দ্বারা পবিত্র এই দেশ। এই পবিত্র গঙ্গাজলের এক অংশ চন্দ্রবংশকে উদ্ধার করেছে। এই জল নিখিল বিশ্বের তত্ত্বভূত, পুণ্যার্থীদের শরণাগত (শরণ্যঃ পুণ্যকারিণাম)। এই দেশ সুন্দর কদলীবনের উদ্যানের মতো শোভাযুক্ত। শুধু তাই নয় - এই দেশ ধর্মের আশ্রয়স্থল (ধাম ধর্মস্য), সমস্ত সম্পদের কেন্দ্রস্থল, কল্যাণের আশ্রয়, সৎপুরুষদের আচরণের রত্নভাণ্ডার। এই আর্যাবর্তে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মর্যাদা, তাঁদের শিক্ষণীয় উপদেশ দান সবই গুরুকুলের মাধ্যমে অর্থাৎ আশ্রমে গুরুগৃহে থেকে শিক্ষা দেওয়া হয়। তাই ত্রিবিক্রমভট্ট বলেছেন —
“আচার্যভবনমাৰ্যমর্যাদোপদেশানামার্যাবর্তো নাম দেশঃ।”

আর্যাবর্তে বসবাসকারী রোগমুক্ত প্রজাদের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেছেন- এই দেশের প্রজারা নিরন্তর ধর্মকর্মের উপদেশ দ্বারা সবরকমের দৈহিক, দৈবিক ও ভৌতিক বিপদগুলি থেকে মুক্তি পায়। ফলে যতদিন তারা বেঁচে থাকে ততদিন রোগমুক্ত জীবনযাপন করে।

বিপদ তিন প্রকারের - (১) আধিদৈহিক: মানুষের শরীর সম্বন্ধীয় নানা রোগ। এটি ঔষধে নিরাময় সম্ভব। (২) আধিদৈবিক : দেবতাকে অধিকার করে প্রবৃত্ত হয়, যা মানুষের অধীন নয়। যেমন বজ্রপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি। (৩) আধিভৌতিক : ভূত বা হিংস্র জন্তু থেকে আগত বিপদ। বিষধর সাপ, বাঘ, সিংহ প্রভৃতি জন্তু থেকে আগত বিপদ থেকে আর্যাবর্তে বসবাসকারী সকল প্রজা মুক্ত ছিল - "সমস্ত ব্যাধি ব্যতি করাঃ পুরুষায়ুষজীবিন্যঃ।”

সমস্ত প্রজা সুখে বাস করত। কারণ (১) সেদেশে কোনো প্রকার রোগ, বিশেষত কুষ্ঠ রোগ ছিল না। কোনো ওষুধের দোকান ছিল না। ছিল কেবল সুগন্ধি বিক্রির দোকান। (২) শুধু স্ফোটবাদ অর্থাৎ শব্দ ব্রহ্মবাদ ব্যাকরণের জ্ঞাতারাই জানেন। অন্যভাবে বলা যায় – সামান্য ব্যক্তিদের মধ্যে ফোড়া-ফুসকুড়ি (রোগবিশেষ) ছিল না। (৩) তাল (লয়-যতি-সংগীত)-এ সন্নিপাত অর্থাৎ একসঙ্গে দুটো হাতে বাজানো হয়- "যস্যাং দক্ষিণহস্তেন তালং | বামেন যোজয়েৎ। উভয়োর্হস্তয়োঃ পাতঃ সন্নিপাতঃ স উচ্যতে।" কিন্তু প্রজাদের মধ্যে সন্নিপাত (রোগবিশেষ) ছিল না। (৪) জ্যোতিঃশাস্ত্র বা গণনাশাস্ত্রগুলিতে সূর্য-চন্দ্রাদি-নক্ষত্রগণের সংক্রান্তি ছিল। আর্যাবর্তে বসবাসকারীদের মধ্যে কোনো সংক্রমণ বা 'গ্রহকলহ' ছিল না। কেউ গ্রহকলহে আক্রান্ত ছিল না। গ্রহকৃত দুর্দৈব ঘটনা বা রাহুকৃত পীড়ন বা রাহুগ্রাস ছিল না। (৫) ভূতবিকারবাদ অর্থাৎ পৃথিবী, অপ (জল), তেজ, বায়ু, আকাশ প্রভৃতি পঞ্চভূত তত্ত্বের বিকৃতি সাংখ্যদর্শনে ছিল। প্রাণীদের মধ্যে ভূত-প্রেতাদির উপদ্রব বা বিকার ছিল না। (৬) ক্ষয় প্রতিপদাদি তিথিগুলিতেই থাকত, প্রজাদের মধ্যে ক্ষয়রোগ ছিল না। (৭) গুল্ম-লতা বৃদ্ধি বনভূমিতেই ছিল। প্রাণীদের মধ্যে গুল্মরোগ ছিল না। গুল্মরোগ হল প্লিহারোগ। এই রোগের প্রতিষেধক হল আমলকী। (৮) গল-গ্রহণ (গলায় ফাঁস লাগানো) মাছেদের মধ্যে ছিল। অন্য প্রজাদের মধ্যে গলায় ফাঁস লাগানোর ব্যাপার ছিল না। (৯) গণ্ডক (গন্ডার)-এর উত্থান পর্বত ও বনে দেখা যায়। প্রজাদের মধ্যে ফোড়া গণ্ডস্থলে বের হত না। (১০) শূল নামক অস্ত্র চণ্ডীদেবীর মন্দিরে দেখা যায়, কিন্তু কোনো প্রজার মধ্যে অম্লশূল নামক রোগ দেখা যেত না। এইসব কারণে আর্যাবর্ত স্বর্গের চেয়েও বড়ো।

আর্যাবর্তের পরিবেশ, গ্রাম, নগর প্রভৃতি অত্যন্ত মনোরম। সেখানকার গ্রামগুলি অশ্ব দিয়ে সংগ্রামের মতো সুসজ্জিত থাকে। পাহাড়গুলি বনবেষ্টিত এবং হস্তিশাবকে পরিপূর্ণ। নগরগুলি উঁচু উঁচু অট্টালিকার দ্বারা, উত্তম আচরণের দ্বারা অর্থাৎ সবসময় পায়ে নূপুর দ্বারা শোভিত। সেখানে বসবাসকারী লোকজন সর্বদা আকাশে চলমান ঝড়ের মতো গতিশীল অথবা দান তথা ভোগযুক্ত লোকের সমাগম। আর্যাবর্তে অবস্থিত বনগুলি কান্তাদের কথোপকথনরূপী তত্ত্বস্বরূপ যৌবনের সমান প্রিয়াল এবং কাঁঠাল ফলযুক্ত। বিট বা লম্পট পুরুষদের দ্বারা ঘেরা সেবিকাদের মতো বাটিকা বা আবৃত স্থান। নিবৃত্তি বা সুখস্থানগুলি সুন্দর রমণী বা কলত্রের মতো সমান। আখের খেতে দানশালা আছে। সেখানে মানুষ তার রসনিবৃত্তি করে। রাবণের অনুচরেরা ক্রুদ্ধ বানরদের দ্বারা পীড়িত। কূপগুলি গভীর জলে পরিপূর্ণ। কুলবধূরা সাধ্বীদের ব্রত পালনের ফলে তাদের সমস্ত দোষ দূর হয়েছে এবং সূর্যের কিরণের মতো কান্তিযুক্ত হয়েছে। শুধু তাই নয় - গাছের শাখাগুলি ফাল্গুন মাসে অর্থাৎ বসন্ত ঋতুতে পল্লবহীন হয়ে গেলেও মানুষের মধ্যে কখনও বিপদের লেশমাত্র দেখা দিত না। আর্যাবর্তকে স্বর্গের চেয়ে বড়ো বলে মনে করা হয়েছে - "কথং চাসৌ স্বর্গান্ন বিশিষ্যতে।" আর্যাবর্তকে স্বর্গের থেকে বড়ো বলে মনে করার কারণ হিসাবে বলা হয়েছে- (১) আর্যাবর্তে বসবাসকারী ব্যক্তিগণ সর্বদা প্রসন্নচিত্ত থাকেন। স্থানটি শোভন রাজ্য হিসাবে বিবেচিত - "সৌরাজ্য-রঞ্জিত মনসঃ।" অর্থাৎ উত্তম রাজ্য হওয়াতে সকলে আনন্দে থাকেন। (২) উত্তম রাজ্য সকল প্রকার সমৃদ্ধির দ্বারা সমৃদ্ধ দেশ-"সকল-সমৃদ্ধি বর্ধিতঃ।" (৩) এই দেশ মহোৎসবের পরম্পরা বা প্রথা মেনে চলে “মহোৎসব পরম্পরারম্ভনির্ভরাঃ।" (৪) উত্তমগুণযুক্ত ব্যক্তি সর্বদা অকুলীন অর্থাৎ কুলহীন পৃথিবীতে লীন থাকে না এমন দেবতাকে, অহংকারহীন ব্যক্তি দেবরথ প্রাপ্ত দেবতাকে, অনেক ধনশালী কিছু অল্পধনপ্রাপ্ত দেবতাকে উপহাস করেন। তাঁরা উপহাস করে বলেন আর্যাবর্ত কী কারণে স্বর্গের সমান বড়ো নয়, অর্থাৎ আর্যাবর্ত স্বর্গের থেকে সবদিক দিয়ে বড়ো। (৫) স্বর্গে একমাত্র গৌরী (উমা) আছেন কিন্তু আর্যাবর্তের ঘরে ঘরে গৌরবর্ণা বা শুদ্ধ ভাবসম্পন্না নারী আছে। স্বর্গে একজন মহেশ্বর আছেন কিন্তু আর্যাবর্তের ঘরে ঘরে অতি সমৃদ্ধ মানুষ আছে। স্বর্গে একজন বিন্নু (হরি) আছেন, আর্যাবর্তের ঘরে ঘরে শোভাযুক্ত ঘোড়া আছে। স্বর্গে একজন কুবের (ধনদ) আছে কিন্তু আর্যাবর্তের স্থানে স্থানে ধনদাতা তথা লোকপাল/লোকরক্ষক আছে। তা ছাড়া, স্বর্গে দেবতাদের রাজা সুরাধিপ ইন্দ্র আছেন, কিন্তু আর্যাবর্তে মদ্যপানকারী রাজা নেই। স্বর্গে একজন বিনায়ক (গণেশ) আছেন, কিন্তু আর্যাবর্তে রাজার বিরুদ্ধাচারী (বি-নায়ক) কেউ নেই। তাই আর্যাবর্ত স্বর্গের থেকেও বড়ো।

কবি ত্রিবিক্রমভট্ট আরও বলেছেন যে, এই দেশ লোকের দ্বারা অনুক্রোশ যোজন যুক্ত বা দয়ার দ্বারা সমৃদ্ধ পুণ্যতম দেশ, যার উত্তর ভাগে ঊর্ধ্ব (উচ্চ) ভাগযুক্ত হিমালয় আছে। এরকম আর্যাবর্ত কার-ই-না প্রিয় হয় অর্থাৎ সকলের প্রিয় জন্মভূমি।