চর্যাপদে যে ধর্মতত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে তা আলোচনা করো।



উত্তর : চর্যার ধর্মতত্ত্বের সন্ধান করতে হলে বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা প্রয়োজন। জন্ম - জরা- মৃত্যু প্রভৃতি দুঃখের কারণ, এবং তা প্রশমনের উপায় নির্দেশ করাই বুদ্ধদেবের জীবনের ব্রত। উপনিষদে বলা হয়েছে যে ব্রহ্ম নিত্য এবং জগৎ অনিত্য অতএব মিথ্যা, আর এই জাগতিক মোহের কারণ যে অবিদ্যা, তা ধ্বংস করতে পারলেই জীবাত্মা পরমাত্মার স্বরূপত্ব লাভ করতে পারে। এটিই মোক্ষ অর্থাৎ অবিদ্যার বন্ধন থেকে বিমুক্ত অবস্থা। আর এরই পারিভাষিক নাম "নির্বাণ"। বুদ্ধদেব প্রচার করলেন যে মোক্ষ বা নির্বাণ লাভই দুঃখ নিরোধের প্রকৃষ্ট উপায়।

নির্বাণের এই সুখবাদ থেকেই পরবর্তীকালে সহজিয়া মতের উদ্ভব হয়েছে। মাধ্যমিক শাস্ত্রে এই আনন্দ তত্ত্বমাত্র, কিন্তু সহজিয়ারা একে রূপদান করেছেন, এর নামকরণ করেছেন, এর বাসস্থান নির্দেশ করেছেন। তাদের মতে ইনি নৈরাত্মাদেবী, সাধক যখন পার্থিব মোহ ছিন্ন করে ধর্মকায়ে (তথতা বা শূন্যতায়) লীন হয়, তখন তিনি নৈরাত্মাকে আলিঙ্গন করে যেন মহাশূন্যে ঝাপিয়ে পড়েন — 

যথা - কণ্ঠে নৈরামণি বালি জাগন্তে উপাড়ি। এবং - মহাসুরে বিলসন্তি শবরো লইআ সুণ- মেহেলী (চর্যা- ৫০)
অন্যত্র - সুণ নৈরামণি কণ্ঠে লইআ মহাসুরে রাতি পোহাই। (চর্যা- ২৮)
নৈরাত্মা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয় বলে অস্পৃশ্যা ডোম্বী, দেহ-নগরীর বাইরে অবস্থান করে।
যথা - নগর বাহিরি ডোম্বি তোহারি কুড়িআ (চর্যা - ১০)।
তান্ত্রিকমতে তার আবাসস্থান দেহ সুমেরুর শিখর প্রদেশে অর্থাৎ উয়ীষ কমলে - যথা - উচা উচা পাবত তহি বসঙ্গ সবরী বালী। (চর্যা- ২৮)
এবং – অধরাতি ভর কমল বিকসিউ ইত্যাদি। ("চর্যা-২৭)
গিরিবর - সিহর – সন্ধি পইসন্তে ইত্যাদি।

সহজ অর্থে সহ-জাত। যে ধর্ম যে বস্তুর জন্ম থেকে স্বতঃ উৎপন্ন, তাই তার সহজ। বৌদ্ধগণ আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না বটে, কিন্তু বোধিচিত্তের নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং এই বোধিচিত্ত যে ধর্মকায় বা তথতা থেকে উৎপন্ন তাও ঘোষণা করেছেন। নিত্যত্ব, করুণা এবং আনন্দ বোধিচিত্তের সহজাত ধর্ম।

একমাত্র যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ অবলম্বণ করে চর্যায় বিবৃত যাবতীয় তত্ত্ব বিশদরূপে ব্যাখ্যাত হতে পারে। যোগবাশিষ্ঠ ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত হয়েছিল বলে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে। তাহলে এর কয়েক শতাব্দী পরে চর্যাগুলি রচিত হয়েছে। অতএব চর্য্যার মতবাদ ব্যাখ্যা করবার জন্য যোগবাশিষ্ঠকেও আদর্শ স্বরূপ গ্রহণ করা যেতে পারে। চর্যাপদগুলিতে মূলতঃ যোগ পন্থার কথাই বলা হয়েছে।

বৈষ্ণব সহজিয়াগণ রূপ, প্রেম ও আনন্দের সাধনা করে থাকেন। বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের মূলতত্ত্ব অরূপ বা শূন্যতা, কল্পনা বা প্রেম এবং মহাসুখ বা আনন্দ। এই হিসাবে উভয় ধর্মের তত্ত্বগত ঐক্য রয়েছে। সীমাবিশিষ্ট রূপই সাধনার বলে আত্যন্তিক অভিব্যক্তিতে অরুপে পরিণত হয়। দৃশ্যের দেহে রূপের অভিব্যক্তি আছে বলেই আমরা দৃশ্যের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমরা ভালোবাসি সেই অভিব্যক্তি রূপকে, আর দৃশ্যের প্রতি আকর্ষণ আসে এটি সেই রূপের আশ্রয় স্থল বলে। এইজন্য দেহে রূপকে স্থায়ী করবার জন্য আমাদের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। কিন্তু মাটির দেহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে বিরূপতা প্রদর্শন করছে। এইজন্য যারা তত্ত্বজ্ঞ তারা দেহ পরিত্যাগ করে শাশ্বত রূপের সন্ধান করে থাকে। বৌদ্ধগণ জগৎকে অস্বীকার করেছেন আর বৈম্নবগণ জগৎকেই স্বীকার করে সসীমের মাঝে অসীমের সন্ধান করেছেন।