বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য প্রভাব বিষয়ে আলোচনা করো।



উত্তর : মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব দেশের এমন এক ক্রান্তিকালে যখন গোটাসমাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল এক মহতী বিনষ্টির দিকে। মহাপ্রভুর আবির্ভাব সেই বিনষ্টির সম্ভাবনাকেই বিনষ্ট করে দিয়েছিল। তাই শ্রীচৈতন্যর আবির্ভাব বাঙালীর জীবনে ছিল এক হিসাবে দেবাশীর্বাদই।

তুর্কী আক্রমণের পর হিন্দুসমাজে জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা দৃঢ়তর হয়ে উঠেছিল। ধর্মের নামে তখন চলছিল বাহ্যিক আড়ম্বর। এতে ভক্তির লেশমাত্র ছিল না। সমাজের উচ্চকোটিতে তখন শঙ্করাচার্যের জ্ঞানবাদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তার আলো সমাজের নিম্নস্তরে এসে পৌঁছাত না। এরই মাঝে চৈতন্যদেব শুনিয়েছিলেন সব বিভেদ-বিদ্বেষ দূরে সরিয়ে রেখে মহামিলনের বীজমন্ত্র। তিনি ঘোষণা করেছিলেন-চণ্ডাল যদি হরিভক্ত হয় তবে সে দ্বিজোত্তম হয়ে ওঠে-

'চণ্ডাল নহে চণ্ডাল যদি কৃল্প বলে। 
বিপ্র নহে বিপ্র যদি অসৎ পথে চলে।'

বস্তুতপক্ষে এই সূত্রেই সেদিন চিরকালের অবহেলিত নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষ শুনতে পেয়েছিল মুক্তির আহ্বান। এর পরই শুধু চণ্ডাল নয়, যবনও পেয়েছিল প্রেম ধর্মে নিজের অধিকারের অস্তিত্ব। ফলতঃ জাতি ভেদাভেদ শুধু নয়, অনেকাংশেই দূরীভূত হয়েছিল ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য। গুরগিরিতে এবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অব্রাহ্মণের অধিকারও। অধ্যাপক ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভাববিপ্লবের স্বরূপটুকুকে চিহ্নিত করেছেন এভাবে " ....এখন আমরা চৈতন্যের জীবনে নব্যমানবতা (Neo-humanism) সমাজ সংস্কার, নীচ জাতিকে উচ্চ শ্রেণিতে গ্রহণ করা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, পতিত পতিতাকে পংক্তিতে স্থান দান ইত্যাদি আধুনিক সমাজ মানসিকতার প্রভাব আবিস্কারের চেষ্টা করিতেছি"।

শুধু বাঙালী সমাজে নয় চৈতন্য প্রভাব পড়েছিল বাংলার বাইরেও, পুরী, বৃন্দাবন মথুরার সঙ্গে বাঙালীর আজও যে যোগাযোগ রয়েছে-হৃদয়ের সেই যোগকে প্রতিষ্ঠা প্রদান করেছিলেন শ্রীচৈতন্যই।

শ্রীচৈতন্যের কাজীদলনের ঘটনার মধ্যে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ। ড. সুকুমার সেন এই ঘটনাটির প্রসঙ্গেই বলছেন "চৈতন্যের এই উদ্যম ভারতবর্ষে শাসকশক্তির বিরুদ্ধে প্রথম চ্যালেঞ্জও"।

ভক্তের দৃষ্টিতে শ্রী চৈতন্যদেব রাধাভাবদ্যুতি সুবলিত প্রকট কৃষ্ণ স্বরূপ। তাই তাঁর বন্দনা করতে গিয়ে আজো ভক্ত বলেন:

“রাধাকৃম্নপ্রণয়বিকৃতিঃ হ্লাদিনীশক্তিরস্মাৎ একাত্মনাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ। চৈতন্যাঘ্যাং প্রকটমধুনা তদ্দয়ঞ্চৈক্যমাপ্তং রাধাভাবদ্যুতি সুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম।"

— ভক্তির এই মার্গ বলে ফেলে আসা দিনেরই কথা। কারণ সেদিন জগাই মাধাই-এর মতো অধঃপতিত মানুষ এই অবলম্বনটুকুকে পাথেয় করেই যুগযন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে চেয়েছিলেন। — সেদিনের সমাজের পক্ষে এই আশ্রয়প্রাপ্তির মূল্যও কম ছিল না।