বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতে সমকালীন যুগের পটভূমিকা পরিস্ফুট হয়েছে – আলোচনা করো।



উত্তর : চৈতন্যদেব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হলেও তার অনুগামীদের বিশ্বাস ছিল তিনি স্বয়ং ভগবানের অবতার।

ভক্তির আতিশয্য এবং অলৌকিকতায় প্রগাঢ় বিশ্বাস সত্ত্বেও পরিপার্শ্ব সম্পর্কে বৃন্দাবন দাসের সজাগ দৃষ্টি ছিল। তিনি নিছক চৈতন্যের জীবনলীলাই বর্ণনা করেন নি নবদ্বীপকেন্দ্রিক বৈল্পব ধর্ম আন্দোলনের ইতিহাসকে প্রতিকূল ও অনুকূল সামাজিক সংঘর্ষের পটভূমিকায় দাঁড় করিয়েছেন। জীবনাচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ পরিণত দিব্যভাব জীবনের অধিকারী “দৃষ্ট পৃষ্ট কীর্তিত" এক নরদেবতার বিশ্বাস্য কাহিনি।

চৈতন্য ভাগবতকে ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির আকর গ্রন্থ বললে ভুল বলা হয় না। চৈতন্যের আবির্ভাবের সমকালের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থার যে পরিচয় বৃন্দাবন দাস দিয়েছেন তা কেবল তথ্য সমাবেশে সমৃদ্ধ নয়, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাতেও স্পষ্ট ও উজ্জ্বল।

চৈতন্যের সমকালে বাংলার শাসন ব্যবস্থা, সামাজিক অর্থনীতি, জনসাধারণের অবস্থার যে ছবি চৈতন্যভাগবত-এ ফুটে উঠেছে তা বস্তুনিষ্ঠ, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি শূন্য ও ইতিহাস সম্মত। সে সময় "পরম দুর্বার" হুসেন শাহ গৌড়ের সুলতান। উড়িষ্যার সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে "দেবমূর্তি" "দেউলবিশেষ" ভাঙলেও বৃন্দাবন দাসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনিই চৈতন্যকে অপ্রকাশ্যে ও প্রকাশ্যে ধর্মাচারণের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সে সময়ে সাধারণ হিন্দু মুসলমান বিরোধের কোনো উল্লেখ নেই। শরিয়তি আইন অনুসারে ধর্মান্তরিত মুসলমান হরিদাসকে কাজি কঠোরভাবে দণ্ডিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মুসলমান যে তাতে উল্লসিত হয়েছিল তার প্রমাণের অভাব, বরং মুলুকপতি মুসলমান হয়েও বেদনাবোধ করেছিলেন। নবদ্বীপের কাজি বা শাসনকর্তার কীর্তন নিষেধকেও বিধর্মী বিদ্বেষ বলা চলে না। কারণ সংকীর্তন ছিল প্রচলিত হিন্দু ধর্মবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে অশাস্ত্রীয়। কাজি প্রশাসনিক দায়িত্ব বোধেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবে কীর্তনবিদ্বেষী কাজি যে একেবারে ছিল না তা নয়, বৃন্দাবন দাস এক গ্রাম্য কাজির উল্লেখও করেছেন।

বৃন্দাবন দাসের কৃতিত্ব ষোড়শ শতাব্দীর প্রাককালের বাঙালি সমাজ ও জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত পরিবেশ ও পরিমন্ডল রচনায়। চৈতন্যের দিব্যলীলার কাহিনী হয়েও সেকালের বাঙালির জীবনযাত্রা ও জীবনচর্চার দর্পণ হয়ে উঠেছে। কেবল চৈতন্যজীবনী হিসেবে নয়, চৈতন্যভাগবত এর মহিমা দেশ কাল অতিক্রম করেছে।