শ্রী শংকরাচার্য বা আদি শংকর
![]() |
| কবি শ্রীশংকরাচার্য |
শ্রীশংকরাচার্য যিনি 'আদি শংকর' (৭৮৮-৮২০ খ্রিস্টাব্দ) নামে অধিক পরিচিত, তিনি ভারতবর্ষের অন্যতম ধর্মসংস্কারক, অদ্বৈত বেদান্তের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার এবং ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর শিক্ষার মূল কথা হল আত্মা ও ব্রহ্মের সম্মিলন। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সার্থক সমন্বয় এই ক্ষণজন্মা দার্শনিকের জীবনে ঘটেছিল। জ্ঞানবর্জিত কর্মবাদ এবং কর্মবর্জিত জ্ঞানবাদ এই দুয়ের তিনি বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে অবিদ্যা (কর্ম) দ্বারা মৃত্যুকে অতিক্রম করে বিদ্যা (জ্ঞান) দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করা যায়। ভারতবর্ষের সনাতন আদর্শ রক্ষায় তিনি দেশের চারপ্রান্তে চারটি মঠ যেমন - পূর্বপ্রান্তে পুরীতে গোবর্ধন মঠ, পশ্চিমপ্রান্তে দ্বারকায় শারদা মঠ (গুজরাট), উত্তরপ্রান্তে বদরিকায় যোশি মঠ (উত্তরাখন্ড) এবং দক্ষিণপ্রান্তে রামেশ্বরে শৃঙ্গেরী মঠ (কর্ণাটক) স্থাপন করেন। গুরুপরম্পরা রক্ষার জন্য তিনি দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায় প্রবর্তন করেন। যেমন - সরস্বতী, ভারতী, পুরী, তীর্থ, আশ্রম, বন, অরণ্য, গিরি, পর্বত ও সাগর। তিনি বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন।
কর্মজীবন : শ্রীশংকরাচার্য ছিলেন সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত, বিদগ্ধ ব্যাখ্যাকার, তীক্ষ্ণধী তার্কিক, কবি, দার্শনিক এবং হিন্দুধর্মের প্রবর্তক। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দির দর্শনকালে চারটি কুকুরের সঙ্গে চণ্ডালরূপী শিবকে চিনতে পেরে পাঁচ শ্লোক বিশিষ্ট 'মণীষা পঞ্চকম্' রচনা করেন। বদ্রীনাথ থেকে তিনি বিখ্যাত ভাষ্য (টীকা গ্রন্থ) ও প্রকরণগুলি (দর্শনমূলক প্রবন্ধ) রচনা করেন। শংকরাচার্য বিখ্যাত পণ্ডিত মণ্ডন মিশ্র, তাঁর গুরু বৌদ্ধ মীমাংসা দার্শনিক কুমারিল ভট্ট এবং মন্ডনের স্ত্রী উভয়া ভারতীকে তর্কে পরাজিত করেন। মণ্ডন মিশ্র সুরেশ্বরাচার্য নামে তাঁর কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
বিদেহ মুক্তি : মাধব শংকর বিজয়ন অনুসারে শ্রীশংকরাচার্যের হিমালয়ের কেদারনাথ-বদ্রীনাথে বিদেহ মুক্তি ঘটে। কেদারনাথ মন্দিরের পিছনে তাঁর সমাধি আছে। কারও মতে কাঞ্চিপুরমে (তামিলনাডু), কেরলীয় মতে কেরলের থ্রিসুরের বদাকুন্নাথান মন্দিরে শ্রীশংকরাচার্যের মাত্র ৩২ বছর বয়সে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে।
গ্রন্থাবলি : শংকরাচার্যের গ্রন্থগুলি হল :—
(১) ভাষ্য (সাহিত্যের ব্যাখ্যা) : (ক) শ্রুতিপ্রস্থান : দশটি উপনিষদ ভাষ্য — ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক। গায়ত্রীভাষ্য, নৃসিংহপূর্বতাপনীয়, শ্বেতাশ্বর প্রভৃতি। (খ) স্মৃতিপ্রস্থান : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ভাষ্য। (গ) ন্যায়প্রস্থান : বাদরায়ণ কৃত ব্রহ্মসূত্রের শারীরক ভাষ্য।
(২) প্রকরণ গ্রন্থ (দার্শনিক রচনা) : গ্রন্থের সংখ্যা ৮০টি। যেমন - চূড়ামণি, আত্মবোধ, উপদেশসাহস্রী, বাক্যসুধা (৪৬ শ্লোক), মণিরত্নমালা, অদ্বৈতানুভূতি ইত্যাদি।
(৩) কাব্যসমন্বিত শৈব, শাক্ত ও বৈষুব সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবদেবীর স্তোত্র : ভ্রমরাম্বাষ্টক, মোহমুদ্গর, গঙ্গাস্তোত্রম্, দক্ষিণামূর্তি স্তোত্র, হরিমীড়ে স্তোত্র, আনন্দলহরী, সৌন্দর্যলহরী প্রভৃতি।
(৪) অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : সনৎ সুজাতীয় ভাষ্য, ললিতাত্রিশতী ভাষ্য, বিবেকচূড়ামণি শতশ্লোকী, আত্মবোধ, অপরোক্ষানুভূতি, দশশ্লোকা, পঞ্চীকরণ, মহাবাক্যার্থ বিবরণ, অনুভব-পঞ্চরত্ন, প্রপঞ্চসার, সর্ববেদান্ত সিদ্ধান্তসার সংগ্রহ, নির্গুণ মানস পূজা, দৃগ্দর্শনবিবেক, অদ্বৈতবোধামৃত, আত্মসাম্রাজ্যসিদ্ধি, আত্মানাত্মাবিবেক, আত্মজ্ঞানোপদেশ-বিধি।
