কবি ত্রিবিক্রমভট্ট
![]() |
| লেখক |
সমস্ত চম্পুকাব্যের মধ্যে ‘নলচম্পু' বা ‘দময়ন্তীকথা' সাহিত্যিক দৃষ্টিতে মহত্ত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। এই গ্রন্থের রচয়িতা মহাকবি ত্রিবিক্রমভট্টের জন্ম বিদর্ভ প্রদেশের কোনো-এক গ্রামে শাণ্ডিল্যগোত্রীয় কর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর পিতা নেমাদিত্য বা দেবাদিত্য। পিতামহ হলেন শ্রীধর। তাঁর পিতা, পিতামহ যজ্ঞাদি ধার্মিক অনুষ্ঠানের কর্তা এবং পৌরাণিক প্রবচন কর্তা ছিলেন। নলচম্পুর বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে ত্রিবিক্রমভট্টের পিতার নাম ‘দেবাদিত্য' পাওয়া যায় —
“তেষাং বংশে বিশদয়শসাং শ্রীধরস্যাত্মজোহভৃত্ দেবাদিত্যঃ স্বমতিবিকসদ্ বেদবিদ্যাবিবেকঃ। উৎকল্লোলাং দিশি দিশি জনাঃ কীর্তিপীযূষসিন্ধুং। যস্যাদ্যাপি শ্রবণপুটকৈঃ কূণিতাক্ষাঃ পিবত্তি।।”
আবির্ভাব কাল : বরোদার কাছে নৌসারী গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রপত্র অভিলেখ পত্রের অনুসারে ইন্দ্ররাজ তৃতীয়র রাজ্যাভিষেক হয় ৯১৫-১৬ খ্রিস্টাব্দে। তাতে ইন্দ্ররাজ তৃতীয়র পট্টবনোৎসবের অনেক দানপুণ্যের প্রশস্তিকথা পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রে প্রাপ্ত শিলালেখে রাজা ইন্দ্র তৃতীয়র প্রশংসায় বলা হয়েছে —
“শ্রীত্রিবিক্রমভট্রেন নেমাদিত্যস্য সূনুনা।
কৃতা শস্তা প্রশস্তেয়মিন্দ্ররাজাংগ্রিসেধিনা।।”
ত্রিবিক্রমভট্ট বিষয়ে কিংবদন্তি ছিল যে, কোনো একসময়ে সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত দেবাদিত্য নামে রাজপণ্ডিত ছিলেন। যাঁর পুত্র ছিলেন ত্রিবিক্রমভট্ট। উপরোক্ত শ্লোকের দ্বারা জানা যায় ত্রিবিক্রমভট্টের আবির্ভাব কাল ছিল দশম শতকের প্রথমার্ধে।
কিংবদন্তী : বোম্বাই থেকে প্রকাশিত ‘নলচম্পূ’-র ভূমিকাতে বলা হয়েছে বেদবিদ্যা বিষয়ক সব শাস্ত্রে পণ্ডিত দেবাদিত্য নামে এক রাজসভার পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর ত্রিবিক্রম নামে এক মহামূর্খ পুত্র ছিল। ‘নলচম্পূ’-র প্রথম উচ্ছ্বাসের ২০নং শ্লোকে বলা হয়েছে —
“তৈস্তৈরাত্মগুণৈর্যেন ত্রিলোক্যাস্তিলকায়িতম্।
তস্মাদস্তি সুতো জাতো জাড্যপাত্রং ত্রিবিক্রমঃ।।”
প্রথমে ত্রিবিক্রম অসৎসঙ্গে পড়ে পড়াশোনা করতেন না। একদিন কাজের তাগিদে দেবাদিত্য কোনো গ্রামে চলে যান। সেই সময় কোনো বিদ্বান/পণ্ডিত রাজার কাছে এসে রাজসভায় শাস্ত্র আলোচনার দাবি করেন। যদি তা সম্ভব না হয় তবে সেই পণ্ডিতকে তর্কযুদ্ধের ‘বিজয়পত্র' দেওয়া হোক। রাজা তখন সভাপণ্ডিত দেবাদিত্যকে ডেকে পাঠান। ঘরে দেবাদিত্যকে না-পেয়ে তাঁর পুত্র ত্রিবিক্রমভট্টকে শাস্ত্রার্থ আলোচনা করতে রাজসভায় আনেন। শাস্ত্রার্থ আলোচনার কথা শুনে মূর্খ ত্রিবিক্রম তাঁদের কুলদেবী সরস্বতীর আরাধনা করতে থাকেন। কুলদেবী সরস্বতী তাঁর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে বর দিলেন – যতক্ষণ-না তাঁর পিতা দেবাদিত্য ফিরে আসেন, ততক্ষণ তাঁর মুখে স্বয়ং সরস্বতী বিরাজ করবেন। সরস্বতীর কৃপায় ত্রিবিক্রমের প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্ডিত তর্কযুদ্ধে পরাজিত হন। বাড়ি ফিরে পিতার ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি ‘নলচম্পূ’ রচনায় ব্রতী হলেন। পিতার ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি ‘নলচম্পূ’-র সপ্তম উচ্ছ্বাস (অধ্যায়) পর্যন্ত লিখে ফেলেন। ফলে মহাভারতের বনপর্বে অবস্থিত পুণ্যশ্লোক রাজা নল অবলম্বনে 'নলচম্পু' সপ্তম উচ্ছ্বাসে অসম্পূর্ণ অবস্থায় সমাপ্ত হয়।
গ্রন্থরচনা : কবি ত্রিবিক্রমভট্টের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হল —
(১) নলচম্পু : কাব্য সৌষ্ঠবের দিক থেকে আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত সমস্ত চম্পুকাব্যের মধ্যে 'নলচম্পু' সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন। সাতটি উচ্ছ্বাস বা অধ্যায় বিশিষ্ট এই কাব্যের উৎস হল কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত ‘মহাভারতম্’-এর অন্তর্গত বনপর্বের 'নলোপাখ্যান পর্বাধ্যায়'-এর নল-দময়ন্তীর প্রেমগাথা।
(২) মদালসাচম্পু : এটি একটি প্রণয়গাথা। এর নায়ক কুবলয়াশ্ব, নায়িকা মদালসা। এর কাহিনি হল মার্কণ্ডেয় পুরাণের ১৮ অধ্যায় থেকে ২১ অধ্যায়ে বর্ণিত কাহিনি। এই গ্রন্থে কুবলয়াশ্ব চরিত, পাতালকেতু বধ, মদালসা পরিণয়, কুবলয়াশ্বের নাগরাজের গৃহে গমন এবং সেখানে মদালসার পুনঃপ্রাপ্তি প্রভৃতি বিষয় স্থান পেয়েছে।
