চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরামের কাব্যে যে উপন্যাসের লক্ষণগুলি পাওয়া যায় তা আলোচনা করো।
মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ধারা। সমকালীন অন্যান্য কাব্যের মতো এই কাব্যও দেবদেবী নির্ভর।
মঙ্গলকাব্য ধারার ইতিহাসে চন্ডীমঙ্গলের স্থান সর্বোচ্চে। চন্ডীমঙ্গলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী নিজের রচনা সৌ-দর্যে চন্ডীমঙ্গল কাব্যকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। চন্ডীমঙ্গলের প্রচলিত কাহিনিই তিনি গ্রহণ করেছেন। সুতরাং কাহিনি সৃষ্টির গৌরব কবির প্রাপ্য নয়। কবির আত্মবিবরণী অংশে যে দুঃখ বেদনার কথা আছে তা সমকালীন সাধারণ মানুষেরই জীবন চিত্র। ফুল্লরার দরিদ্র জীবনের তারই প্রতিচ্ছবি। পশুদের নালিশে সমকালীন সমাজের নিদারুণ চিত্র অঙ্কিত।
কালকেতু, ফুল্লরা, মুরারী শীল, ভাঁড়ু দত্ত, খুল্লনা, লহনা, দুর্বলা দাসী ইত্যাদি চরিত্র কবির প্রতিভাস্পর্শে রক্ত মাংসের সাধারণ মানুষ। লোভ, অভিমান, পরশ্রীকাতরতা, শঠতা, প্রবঞ্চনা, প্রতিহিংসা প্রভৃতিতে এরা মানবিক। ফুল্লরা ছদ্মবেশী দেবী চণ্ডীকে যে দুঃখময় বারমাস্যা শুনিয়েছে তাতে প্রকারান্তরে তার সপত্নী সংসার আশঙ্কাই বড় হয়ে উঠেছে। কালকেতুর আচরণে আরণ্যক জীবনবৈশিষ্ট্য বিম্বিত। দেবীর কৃপালব্ধ সাত ঘড়া ধন বয়ে নিয়ে যাবার জন্য দেবীকে সে অনুরোধ করেছে। ভক্তের অনুরোধে ঘড়া কাঁধে তিনি কালকেতুর পিছে পিছে চললেন। আশঙ্কিত কালকেতু বারবার তাকে পিছন ফিরে দেখেছে। এ অংশের বর্ণনা অত্যন্ত বাস্তব।
কালকেতুর আগমন বার্তায় ভীত হয়েছে মুরারী। ধারে নেওয়া মাংসের দামের জন্য এসেছে মনে করে সে আত্মগোপন করেছে। কিন্তু কালকেতু আংটি বিক্রয়ের জন্য এসেছে শুনে লোভী বণিক খিড়কির দরজা পথে তার সামনে উপস্থিত হয়েছে। এ সময়ে কালকেতুকে ছলনা করার যে সংক্ষিপ্ত চিত্র কবি তুলে ধরেছেন তা অনবদ্য। ভাড়ু দত্ত স্বাভাবিক নীচতার প্রতীক। তার আচরণে খল চরিত্রের বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। এই চরিত্রের বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই।
মধ্যযুগের সীমাবদ্ধ স্বাভাবিক অবস্থায় মুকুন্দ চক্রবর্তী ছিলেন মানবতার প্রবক্তা। ঔপন্যাসিক দৃষ্টি ভঙ্গিই তাকে বাস্তব জীবন চিত্রের সার্থক শিল্পী হসেবে চিহ্নিত করেছে।