বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস | 1st Semester
![]() |
| 1st Semester BENG-G-CC & BENG-H-GE |
ভূমিকা : কোনো একটি ভাষা ও সাহিত্য কেমন পরিবেশে সৃষ্ট হয়ে নানা প্রতিকূলতা ও ক্রমবিবর্তনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে তার কালানুক্রমিক বর্ণনা এবং তার বিচিত্র গতিপ্রকৃতি বর্তমান রূপ ও ভবিষ্যৎ পরিণতির আভাস দান করাই সাহিত্যের ইতিহাসের কাজ। সাহিত্যের ইতিহাস একাধারে রসঋদ্ধ সাহিত্য ও তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস।
আমাদের দেশের আদি নাম বঙ্গদেশ। আমাদের দেশ, জাতি ও ভাষার মূল শিকড় হল সম্ভবত অস্ট্রিক আগত শব্দ বঙ্গ। ঋগ্-বেদের ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দটির উল্লেখ থেকে বঙ্গ নামটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে অনুমান করা যায়। তবে বাংলা নামটি অর্বাচীন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি আক্রমণের পর বাংলা শব্দটির ব্যবহার বাড়তে থাকে।
আর্যদের সংস্কৃত ভাষা বা দেবভাষা মানুষের মুখে মুখে যুগে যুগে পরিবর্তিত হতে থাকে। সৃষ্টি হয় প্রাকৃতজনের ভাষা প্রাকৃত। পূর্বভারতে প্রায় ২০০ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত থেকে যে প্রাকৃত ভাষার সৃষ্টি হয় তাকে বলে মাগধী প্রাকৃত। প্রায় ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে মাগধী প্রাকৃত থেকে সৃষ্টি হল মাগধী অপভ্রংশের। তার পূর্বী শাখা থেকে খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়। অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে ওঠে বাংলা অক্ষররীতি বা লিপি (script)। বাংলা ভাষার উদ্ভব থেকে ক্রমবিকাশ পর্বটিকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এভাবে বিন্যস্ত করা যায় —
• বাংলাভাষা ও সাহিত্যের যুগ :—
1. প্রাচীনযুগ (৯০১-১২০০খ্রি:)
2. মধ্যযুগ (১২০১-১৮০০ খ্রি:)
3. আধুনিক যুগ (১৮০১-বর্তমান সময়)
খ্রিস্টিয় দশম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার উদ্ভব বা বাংলা সাহিত্যের জন্মের আগেও বাঙালী লেখকগণ সংস্কৃত সাহিত্য রচনা করেছিলেন; যেমন অভিনন্দ নামে বাঙালী কবি রচনা করেন রামচরিত কাব্য। অনেকে অনুমান করেন মুদ্রারাক্ষস, বেণীসংহার, অনর্ঘরাঘব, চন্ডকৌশিক প্রভৃতি নাটক বাঙালী নাট্যকারদের রচিত।
কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয় ও সদুক্তি কর্ণামৃত কাব্যসংকলন দুটিতে যেসব ছোটো ছোটো কবিতা সংকলিত হয়েছে সেগুলিতে বাঙালী জীবনের নানা সরস চিত্র রয়েছে।
অনেকে মনে করেন বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি জয়দেব প্রথমে বাংলায় গীতগোবিন্দ রচনা করেন এবং পরে সেটি সংস্কৃতে অনূদিত হয়।
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম স্তরে রচিত হয়েছিল সিদ্ধাচার্যদের চর্যাপদগুলি - বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন। এগুলি ছাড়া দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলা ভাষার কিছু বিক্ষিপ্ত নিদর্শন পাওয়া যায় প্রাকৃতপৈঙ্গলের কিছু পঙ্ক্তি ও শ্লোকে, কিছু লোকপদবী ও স্থাননামে এবং সর্বানন্দকৃত অমর কোষের টীকায়।
প্রাচীনযুগে নাথধর্মকে অবলম্বন করে গল্পগাথা, কথাসাহিত্য, শূন্যপুরাণ, ডাক ও খনার বচনের লিখিত রূপের কোনো নিদর্শন আদিযুগে পাওয়া যায়নি। দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর "বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" গ্রন্থে এগুলিকে আদিযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় স্তর বা মধ্যযুগের আবার কয়েকটি পর্ব বিভাগ করা চলে —
• মধ্যযুগ :—
(ক) প্রাকচৈতন্য পর্ব (১২০১-১৪৯৩ খ্রি:)
বড়ুচন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, বিদ্যাপতির পদাবলী, শ্রীরাম পাঁচালী, মালাধর বসুর "শ্রীকৃষ্ণবিজয়” ইত্যাদি।
(খ) চৈতন্য পর্ব (১৪৯৩-১৬০৫ খ্রি:)
বৈষ্ণব পদসাহিত্য, জীবনসাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য।
(গ) চৈতন্যোত্তর পর্ব (১৬০৫-১৮০০ খ্রি:)
ঘনরাম, রূপরামের ধর্মমঙ্গল, ভারত চন্দ্রের "অন্নদামঙ্গল" গোবিন্দ দাসের পদাবলি, কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য জীবনী, কাশীরাম দাসের মহাভারতের অনুবাদ, আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজী ও সৈয়দ আলাওলের কাব্য (সতীময়না প্রভৃতি) রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের শাক্ত পদাবলী, বাউল (আউলচাঁদ, লালন ফকির)।
